বাণিজ্য ডেস্কঃ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ ডেটাবেজের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাথাপিছু জিডিপির হিসাবে ভারতকে পেছনে ফেলে দিয়েছে বাংলাদেশ। আগামী দুই অর্থবছর পর্যন্ত এই শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখতে পারে ঢাকা। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল তাদের পূর্বাভাসে জানিয়েছে, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে আবারও মাথাপিছু জিডিপি পুনরুদ্ধার করবে ভারত এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছর নাগাদ দুই দেশের মধ্যকার এই ব্যবধান আরও বাড়াবে দেশটি।
আইএমএফের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বর্তমান মার্কিন ডলারের মূল্যে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮৮৬ ডলারে। এর বিপরীতে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৫০ ডলার। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে মাথাপিছু আয়ের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৩৬ ডলার। ভারতের অর্থনীতির সার্বিক আকার বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় আট গুণ বড় হওয়া সত্ত্বেও ২০২৭-২৮ অর্থবছর পর্যন্ত মাথাপিছু আয়ের সূচকে বাংলাদেশের পেছনেই অবস্থান করবে দিল্লি। তবে আইএমএফের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি বেড়ে দাঁড়াবে ৩ হাজার ৬৬২ ডলারে, যা বাংলাদেশের ৩ হাজার ৩৩৪ ডলারের প্রক্ষেপণকে অতিক্রম করে যাবে। এছাড়া ২০৩০-৩১ অর্থবছর নাগাদ এই ব্যবধান আরও বেড়ে প্রায় ৭০৯ ডলারে পৌঁছাবে, যখন ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হবে ৪ হাজার ৩৮র্থ ৯ ডলার এবং বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা দাঁড়াবে ৩ হাজার ৬৮০ ডলারে।
অর্থনৈতিক এই ওঠানামার পেছনের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এর আগে ২০১৮ সাল থেকে টানা সাত বছর ভারতের চেয়ে বেশি মাথাপিছু জিডিপি বজায় রেখেছিল বাংলাদেশ। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে বাংলাদেশকে সাময়িকভাবে পেছনে ফেলেছিল ভারত। সাধারণত একটি দেশের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনকে মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে মাথাপিছু জিডিপি হিসাব করা হয়। এটি জনপ্রতি গড় অর্থনৈতিক উৎপাদনের একটি সার্বিক পরিমাপ তুলে ধরলেও জনগণের প্রকৃত আয় বণ্টন বা জীবনযাত্রার সঠিক খরচের নিখুঁত চিত্র তুলে ধরতে পারে না।
তবে বিভিন্ন দেশের জীবনযাত্রার ব্যয়ের পার্থক্য বিবেচনায় আনলে এই মাথাপিছু আয়ের চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। ক্রয়ক্ষমতার সমতার ভিত্তিতে মাথাপিছু জিডিপির হিসাবে এখনও বাংলাদেশের চেয়ে অনেকখানি এগিয়ে রয়েছে ভারত। পণ্য ও সেবামূল্যের পার্থক্য সমন্বয় করে নির্ধারিত এই সূচকে আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারতের মাথাপিছু জিডিপির প্রক্ষেপণ ধরা হয়েছে ১২ হাজার ৯৯৮ ডলার, অন্যদিকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা ধরা হয়েছে ১০ হাজার ৮৮৪ ডলার। এই হিসাবের ভিত্তিতে বাংলাদেশ থেকে ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ এগিয়ে রয়েছে ভারত। ১৯৯৪ সাল থেকেই পিপিপি সূচকে টানা এগিয়ে রয়েছে দিল্লি এবং ২০৩১ সাল পর্যন্ত তারা এই শীর্ষ অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি ব্যবধান বাড়িয়ে প্রায় ৪৫ শতাংশে উন্নীত করবে।
চলতি মূল্যে মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশ সাময়িকভাবে এগিয়ে থাকলেও আইএমএফের পুরো পূর্বাভাস জুড়ে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি হিসেবে ভারতের অবস্থান সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতের সামগ্রিক জিডিপির আকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৪ দশমিক ০৬ ট্রিলিয়ন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০৩০-৩১ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৭৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে। একই সাথে দেশটিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৭ দশমিক ০২ শতাংশ এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৮১ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে বলে ধরা হয়েছে।
ভারতের এই দ্রুতগামী প্রবৃদ্ধির বিপরীতে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে সবচেয়ে মন্থর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির রেকর্ড করতে পারে বাংলাদেশ। প্রক্ষেপণ অনুসারে, দেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ২০২৭-২৮ অর্থবছরে কমে ২ দশমিক ২১ শতাংশে নামার সুযোগ রয়েছে। পরবর্তীকালে ২০৩০-৩১ অর্থবছর নাগাদ তা সামান্য পুনরুদ্ধার হয়ে ২ দশমিক ৯৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। আইএমএফের এই বর্তমান প্রক্ষেপণটি ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হওয়ার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট জিডিপির আকার দাঁড়িয়েছে ৫০৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে, যা ২০৩০-৩১ অর্থবছর নাগাদ বেড়ে ৬৭৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
সার্বিক দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের ভূ-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে মাথাপিছু জিডিপির দিক থেকে বাংলাদেশ এখনও অঞ্চলটির কয়েকটি দেশের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৯ হাজার ৫০৭ ডলার মাথাপিছু জিডিপি নিয়ে এই অঞ্চলে সবার শীর্ষে অবস্থান করছে মালদ্বীপ। তালিকার পরবর্তী স্থানগুলোতে রয়েছে শ্রীলঙ্কা (৫,০৬২ ডলার) এবং ভুটান (৪,৯ ৩৩ ডলার)। অন্যদিকে এই তালিকায় পাকিস্তানের মাথাপিছু জিডিপি ধরা হয়েছে ১ হাজার ৮৩৬ ডলার এবং নেপালের ক্ষেত্রে পুরো অঞ্চলের সর্বনিম্ন ১ হাজার ৫৪০ ডলার প্রক্ষেপণ প্রকাশ করা হয়েছে।
