খেলাধুলা ডেস্কঃ বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার ওপর চাপ বাড়িয়েছে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার ফুটবল সংস্থাগুলো। ফিফার প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর প্রস্তাবিত বাণিজ্যিক উদ্যোগ ও সংস্থার আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিরোধের মধ্যেই নতুন করে অর্থ বিতরণ ও স্বাধীন পর্যালোচনার দাবি উঠেছে।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা উয়েফা এবং উত্তর, মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের ফুটবল সংস্থা কনকাকাফের প্রধানরা ফিফার ২১১ সদস্য দেশকে অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। পাশাপাশি ফিফার আর্থিক রিজার্ভ ও বিতর্কিত বাণিজ্যিক উদ্যোগ নিয়ে স্বাধীন পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
২১১ সদস্য দেশকে ১০ মিলিয়ন ডলার করে দেওয়ার প্রস্তাব
উয়েফা সভাপতি আলেকসান্দার চেফেরিন এবং কনকাকাফ সভাপতি ভিক্টর মন্টাগলিয়ানি ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর কাছে পাঠানো চিঠিতে প্রতি সদস্য দেশকে অন্তত ১ কোটি মার্কিন ডলার করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৭ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত চার বছরে ফিফার ২১১ সদস্য সংস্থাকে এই অর্থ দেওয়া হতে পারে। সব সদস্যকে অর্থ দেওয়া হলে মোট ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ফুটবল অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে ফুটবলের বিকাশে এই অর্থ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। উয়েফা ও কনকাকাফের প্রধানদের মতে, ফিফার আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় এই অর্থ বিতরণ সম্ভব।
ফিফার রিজার্ভ নিয়ে প্রশ্ন
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩-২৬ চক্রের শেষে ফিফার আর্থিক রিজার্ভ প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এই অর্থের একটি অংশ সদস্য দেশগুলোর ফুটবল উন্নয়নে ব্যবহারের দাবি তুলেছেন উয়েফা ও কনকাকাফের প্রধানরা।
তাদের প্রস্তাবে আর্থিক স্বচ্ছতা ও সুশাসনের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। অর্থ বিতরণের আগে ফিফার আর্থিক সক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে পর্যালোচনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিতর্কিত বাণিজ্যিক উদ্যোগ নিয়ে বিরোধ
ফিফার ওপর চাপ তৈরির পেছনে অন্যতম কারণ সংস্থাটির ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ বা FFE প্রকল্প। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ফিফার বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক ও টিকিট বিক্রির অধিকার পরিচালনার জন্য একটি নতুন কোম্পানি গঠনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
পরিকল্পনায় বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে ওই কোম্পানির অংশীদারত্ব বিক্রির বিষয় ছিল। এতে বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক অধিকার ব্যবস্থাপনায় বাইরের বিনিয়োগ যুক্ত হওয়ার কথা ছিল।
তবে উয়েফা, কনকাকাফসহ কয়েকটি আঞ্চলিক ফুটবল সংস্থা এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে। সমালোচকদের দাবি, এত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে যথেষ্ট স্বচ্ছতা ও পরামর্শের ঘাটতি ছিল।
বিরোধের মুখে ফিফা আগস্টে ওই উদ্যোগ প্রত্যাহার করে নেয়। তবে পরিকল্পনাটি কীভাবে তৈরি হয়েছিল, কারা এতে যুক্ত ছিল এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যথেষ্ট নজরদারি ছিল কি না—এসব প্রশ্ন এখনো রয়েছে।
স্বাধীন তদন্তের দাবি
উয়েফা ও কনকাকাফের পক্ষ থেকে ফিফার বিতর্কিত বাণিজ্যিক উদ্যোগ নিয়ে স্বাধীন পর্যালোচনার দাবি জানানো হয়েছে। তাদের মতে, ভবিষ্যতে ফিফার বড় ধরনের আর্থিক ও বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন।
এদিকে ফিফা উয়েফার আইনি পদক্ষেপকে ‘স্মিয়ার ক্যাম্পেইন’ বা ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার প্রচেষ্টা বলে অভিহিত করেছে। সংস্থাটির দাবি, উয়েফার কর্মকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে।
অন্যদিকে উয়েফা জানিয়েছে, ফিফার সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া ও বাণিজ্যিক পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া প্রয়োজন। এই বিরোধের মধ্যেই দুই পক্ষের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও প্রকাশ্য হয়েছে।
ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে চাপ
ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিতর্কিত বাণিজ্যিক উদ্যোগের পাশাপাশি বিশ্বকাপের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও ফিফার প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে ইউরোপের কয়েকটি ফুটবল সংস্থা অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।
আগস্টে নর্ডিক অঞ্চলের ছয়টি ফুটবল সংস্থা—সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, আইসল্যান্ড ও ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জ—ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের ওপর আস্থা হারানোর কথা জানায়। তারা ফিফার শাসনব্যবস্থা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় স্বাধীন পর্যালোচনার দাবি জানায়।
এদিকে ইনফান্তিনো ২০২৭ সালের মার্চে ফিফা প্রেসিডেন্ট পদে চতুর্থ মেয়াদে নির্বাচনের জন্য প্রার্থী হওয়ার পরিকল্পনা জানিয়েছেন। তার নেতৃত্ব নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যে এই নির্বাচনকে সামনে রেখে ফিফার প্রশাসনিক কাঠামো ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা বাড়ছে।
সামনে ফিফা কাউন্সিলের বৈঠক
উয়েফা ও কনকাকাফের প্রস্তাব আগামী ১৫ অক্টোবরের ফিফা কাউন্সিলের বৈঠকে আলোচনার জন্য তোলা হতে পারে। সেখানে ফিফার আর্থিক রিজার্ভ, সদস্য দেশগুলোকে অর্থ বিতরণ এবং বিতর্কিত বাণিজ্যিক উদ্যোগ নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
তবে এখনো ফিফার পক্ষ থেকে প্রস্তাবটি গ্রহণের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। ফলে ২১১ সদস্য দেশকে অর্থ বিতরণের দাবি বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নির্ভর করছে ফিফার পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।
বিশ্ব ফুটবলের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে এই বিরোধের মধ্য দিয়ে ফিফার নেতৃত্ব, স্বচ্ছতা এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অর্থ বণ্টনের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
