বিশেষ প্রতিবেদকঃ ইউনানি চিকিৎসা মানেই প্রাকৃতিক উপাদানে ধীরে ধীরে আরোগ্য—বাংলাদেশ জাতীয় ইউনানি ফর্মুলারির মূল দর্শন এমনটাই বলে। কিন্তু সেই দর্শনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে পাবনার দক্ষিণ মাসিমপুরে অবস্থিত ইউনিটেক ফার্মাসিউটিক্যালস (ইউনানি)। প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত কিছু ইউনানি ওষুধ ঘিরে বাজারে ছড়িয়ে পড়েছে বিস্ফোরক অভিযোগ। উৎপাদন লাইসেন্স নম্বর ইউ–১৩৭ধারী এই প্রতিষ্ঠানের কয়েকটি জনপ্রিয় পণ্য অস্বাভাবিক কম দামে বিক্রি হওয়া এবং সেবনের পর তাৎক্ষণিক ফল দেখানোর দাবিতে সংশ্লিষ্ট মহলে সৃষ্টি হয়েছে গভীর সন্দেহ।
পাইকারি বাজারের একাধিক সূত্র জানায়, লেবেলে নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় এসব ওষুধ পাঁচ ভাগের এক ভাগ বা তারও কম দামে বিক্রি হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, জেবি-টন (শরবত সেব) যার ডিএআর নাম্বার ইউ-২৩-এ-০১১, ব্যাচ ১০এ২৫, উৎপাদন ডিসেম্বর-২০২৫ এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ডিসেম্বর-২০২৭—লেবেল মূল্য ৩৫০ টাকা হলেও পাইকারি বাজারে এটি বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৪৫ থেকে ৫০ টাকায়। একইভাবে জেবি-জিনসিন (শরবত জিনসিন), ডিএআর নাম্বার ইউ-২৩-এ-০০৮, ব্যাচ ০৯এ২৫—লেবেলে ৩৬০ টাকা উল্লেখ থাকলেও বাজারদর ৭০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে। এফ-গ্লোবিন (শরবত ফওলাদ), ডিএআর নাম্বার ইউ-২৩-এ-০০১—লেবেল মূল্য ৩৫০ টাকা হলেও পাইকারি বাজারে পাওয়া যাচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকায়। বাস্টোম (শরবত বাদিয়ান), ডিএআর নাম্বার ইউ-২৩-এ-০০৬—লেবেল মূল্য ৩৫০ টাকা, বাজারদর ৪০ থেকে ৫০ টাকা। জেবিরল (শরবত এজাজ) কফ সিরাপ, ডিএআর নাম্বার ইউ-২৩-এ-০০২—লেবেলে ৮০ টাকা হলেও পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৮ থেকে ২০ টাকায়। এছাড়া জয়-ওরা-সি (ভিটামিন সি ট্যাবলেট), ডিএআর নাম্বার ইউ-১৭০-এ-০১৭—লেবেলে ২০০ টাকা উল্লেখ থাকলেও বাজারে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
পাইকার ও খুচরা বিক্রেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ওষুধ “মুড়িমুড়কির মতো” বিক্রি হচ্ছে। তাদের দাবি, সেবনের পরপরই রোগীরা শক্তি বা আরামের অনুভূতি পাচ্ছেন, যা সাধারণ ইউনানি ওষুধের ক্ষেত্রে সচরাচর দেখা যায় না। ইউনানি চিকিৎসার স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী ফল পাওয়া যায় ধীরে ধীরে, প্রাকৃতিক উপাদানের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে। কিন্তু এখানে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া মিলছে বলেই সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে—এই দ্রুত কার্যকারিতার পেছনে কি কোনো সিনথেটিক কেমিক্যাল বা স্টেরয়েড জাতীয় উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে?
বাংলাদেশ জাতীয় ইউনানি ফর্মুলারির নীতিমালা অনুযায়ী, ইউনানি ওষুধে ব্যবহারের কথা ঔষধি উদ্ভিদ, প্রাকৃতিক খনিজ উপাদান এবং প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াজাত উপকরণ। সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, যদি এসব পণ্যে রাসায়নিক বা নিষিদ্ধ উপাদান মেশানো হয়ে থাকে, তবে তা নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউনানির নামে কেমিক্যালযুক্ত ওষুধ সেবন করলে লিভার ক্ষতি, কিডনি বিকল হওয়া, হৃদরোগ এমনকি হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে শরীরে বিষক্রিয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
ভোক্তা অধিকারকর্মীদের ভাষ্য, প্রাকৃতিক চিকিৎসার নামে যদি ভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে ওষুধ বাজারজাত করা হয়, তবে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ বাড়ছে এবং ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরসহ নিয়ন্ত্রক সংস্থার জরুরি তদন্তের দাবি জোরালো হচ্ছে। এখন প্রশ্ন একটাই—প্রাকৃতিক চিকিৎসার আড়ালে আদৌ কী বিক্রি হচ্ছে বাজারে?
